মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ফের ‘সিন্ডিকেট’ বিতর্ক, প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ঘিরেও প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি: মো. রবিউল ইসলাম
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও ‘সিন্ডিকেট’ ফিরে আসার অভিযোগ উঠেছে। সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচিত ব্যবসায়ী আমিন নূরের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের খবর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির সাবেক ছাত্রনেতা ও এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ।
সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, এবারও ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার ফলে অতীতের মতো একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হাসনাতের অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছিল। এবার সরাসরি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠান না থাকলেও তাদের আত্মীয়, ঘনিষ্ঠজন কিংবা প্রক্সি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা হচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
তার পোস্টে কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম উল্লেখ করে তাদের নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে এর আগেও ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। ২০২১ সালে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়ে অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা হাজার হাজার কর্মীকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। অনেক কর্মী টাকা পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও দেশটিতে যেতে পারেননি।
হাসনাত আবদুল্লাহর পোস্টে দাবি করা হয়েছে, এবার সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্তির খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বায়রার সাধারণ সদস্যদের বরাত দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, আগেরবার যেখানে এ ধরনের অন্তর্ভুক্তির মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল, এবার তা সাড়ে ১৭ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়েছে। তার আশঙ্কা, এর আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপর গিয়ে পড়তে পারে এবং একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যেতে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরেও পোস্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। হাসনাতের দাবি, সফরের সময় আমিন নূরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছিল, যা সরকারি সফরসূচির অংশ ছিল না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে এ ধরনের বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে ঘিরে অতীতে আমিন নূরের নাম বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে আলোচিত হয়েছে। তাকে কেন্দ্র করে অতীতে সিন্ডিকেট ও শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কথিত বৈঠকের উদ্দেশ্য বা আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সরকারি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, যদি বৈঠকটি রাষ্ট্রীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কেন আনুষ্ঠানিক সফরসূচির বাইরে অনুষ্ঠিত হলো। একই সঙ্গে তিনি জানতে চেয়েছেন, অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে যে ব্যাপক সমালোচনা, তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ হয়েছিল, তার পর আবার একই ধরনের কাঠামো কেন ফিরে আসছে।
বাংলাদেশে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার স্পষ্ট মানদণ্ড প্রকাশ করা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় এই বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ওপর।
অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এবার শ্রমবাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে কোন ২৫টি এজেন্সিকে কী মানদণ্ডে নির্বাচন করা হয়েছে, তাদের মালিকানা ও সংশ্লিষ্টতা কী, এবং শ্রমিকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে—এসব বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের শেষাংশে উঠে এসেছে হতাশার সুর। তার ভাষায়, দীর্ঘ আন্দোলন, তদন্ত ও অতীতের অভিজ্ঞতার পরও যদি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে প্রবাসে ভাগ্য অন্বেষণে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।