
বিশেষ প্রতিনিধি: মো. রবিউল ইসলাম
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পুনর্গঠন করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিন জেলা পরিষদে চেয়ারম্যানসহ মোট ৪৫ সদস্যের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করেছে সরকার।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ও পরবর্তী সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী পরিষদগুলো পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে।
*রাঙামাটি: চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার*
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার (দীপু)। চেয়ারম্যানসহ ১৫ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর গঠিত আগের পরিষদ বাতিল করা হয়েছে।
নতুন পরিষদের সদস্যরা হলেন—
১. দীপন তালুকদার (দীপু) — চেয়ারম্যান
২. শাশ্বত চাকমা — রাঙামাটি সদর
৩. বিল্টু চাকমা — বাঘাইছড়ি
৪. সুবিমল চাকমা — বরকল
৫. অনিল বরণ চাকমা — জুরাছড়ি
৬. উথোয়াইমং মার্মা — কাপ্তাই
৭. পাইচিং মং মার্মা — কাউখালী
৮. প্রেমা তালুকদার — রাজস্থলী
৯. তিমথী খিয়াং — রাজস্থলী
১০. সুপর্ণ দেব বর্মন — গর্জনতলী, রাঙামাটি
১১. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ — তবলছড়ি, রাঙামাটি
১২. তোফাজ্জল হোসেন — লংগদু
১৩. মোহাম্মদ ফারুক — গর্জনতলী, রাঙামাটি পৌরসভা
১৪. নন্দিতা দাশ — মাস্টার কলোনি, রাঙামাটি পৌরসভা
১৫. চন্দ্রা চাকমা — রাজদ্বীপ পাড়া, রাঙামাটি পৌরসভা।
*খাগড়াছড়ি: চেয়ারম্যান ম্রাসাথোয়াই মারমা*
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে ম্রাসাথোয়াই মারমাকে। চেয়ারম্যানসহ ১৫ সদস্যের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
সদস্যরা হলেন—
১. ম্রাসাথোয়াই মারমা — চেয়ারম্যান
২. এম এন আবছার — সদস্য
৩. ক্ষেত্র মোহন ত্রিপুরা — সদস্য
৪. দেব রানী চাকমা — সদস্য
৫. আব্দুল মালেক মিন্টু — সদস্য
৬. মোশাররফ হোসেন — সদস্য
৭. খনি রঞ্জন ত্রিপুরা — সদস্য
৮. কুহেলী দেওয়ান — সদস্য
৯. তাহমিনা সিরাজ সীমা — সদস্য
১০. নারায়ন ত্রিপুরা — মাটিরাঙা
১১. রুমেল মারমা — সদস্য
১২. রিপল চাকমা — সদস্য
১৩. শান্তি প্রিয় চাকমা — সদস্য
১৪. মংসাপ্রু চৌধুরী — সদস্য
১৫. ক্যরী মগ — সদস্য।
প্রকাশিত তালিকায় সব সদস্যের নির্দিষ্ট উপজেলা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে প্রজ্ঞাপনের মূল উপজেলা-ভিত্তিক বণ্টন যাচাই ছাড়া তা সংযোজন করা হয়নি।
*বান্দরবান: চেয়ারম্যান মাম্যাচিং*
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন মাম্যাচিং। তাঁকে চেয়ারম্যান করে ১৪ সদস্যসহ মোট ১৫ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
সদস্যরা হলেন—
১. মাম্যাচিং — চেয়ারম্যান
২. চনুমং — সদস্য
৩. মংক্যনু মারমা — সদস্য
৪. লুসাই মং — সদস্য
৫. মাওসেতুং তংচংগ্যা — সদস্য
৬. দনওয়াই লো — সদস্য
৭. আগস্টিন ত্রিপুরা — সদস্য
৮. অংজাই উই চাক — সদস্য
৯. রিয়াল দাও বম — সদস্য
১০. আবদুল মাবুদ — সদস্য
১১. মশিউর রহমান — সদস্য
১২. মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন — সদস্য
১৩. ক্যউ প্রু খিয়াং — সদস্য
১৪. উম্যাসিং মার্মা — সদস্য
১৫. কাজী নিরুতাঞ্জ বেগম — সদস্য।
প্রকাশিত সংবাদে বান্দরবান সদর, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, রুমাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হলেও প্রত্যেক সদস্যের নির্দিষ্ট উপজেলা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
*গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রত্যাশা, প্রশ্নও থাকছে*
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা পরিষদ পুনর্গঠনকে ঘিরে পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পরিষদগুলোর গঠন ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনাও শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে তিন পার্বত্য জেলার বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করছে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে নাগরিক সমতা ও অংশগ্রহণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, জেলা পরিষদের নতুন কাঠামোতে তার প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বঞ্চনা ও হতাশা রয়েছে। নতুন পরিষদ গঠনের পরও যদি কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের প্রতিনিধিত্ব কম বা উপেক্ষিত মনে করে, তাহলে সেই ক্ষোভ আরও গভীর হতে পারে।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে নতুন পরিষদগুলোর দায়িত্ব হবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার, ন্যায্য অংশগ্রহণ, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার বিষয়টি সমান গুরুত্বে দেখা।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনাতেও পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী—বাঙালি ও নৃগোষ্ঠী উভয়ের বঞ্চনার বিষয় উঠে এসেছে। ফলে নতুন পরিষদগুলোর কাছে প্রত্যাশা থাকবে, কোনো একটি জনগোষ্ঠীর নয়, বরং তিন পার্বত্য জেলার সব নাগরিকের জন্য কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা।
*নির্বাচন এখন বড় প্রশ্ন*
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—কবে হবে নির্বাচিত পরিষদ?
দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্বর্তীকালীন বা সরকার মনোনীত পরিষদের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে নতুন অন্তর্বর্তী পরিষদ দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নির্বাচিত পরিষদ গঠনের পথও পরিষ্কার করার দাবি রয়েছে।
নতুন পরিষদগুলোর সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে—আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা তৈরি করা।
বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি উপেক্ষা না করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি—সবার ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই নতুন জেলা পরিষদগুলো পাহাড়ে আস্থা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।