এক দেশে দুই নীতি কেন? পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তি ঘিরে নতুন বিতর্ক।

বিশেষ প্রতিনিধি মো: রবিউল ইসলাম
বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতি, চুক্তি ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। বিশেষ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় নাগরিক অধিকার, ভূমি, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি ঘিরে পুরোনো বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ অঞ্চলে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বাঙালি জনগোষ্ঠীরও বসবাস রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—একই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য অঞ্চলের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো কতটা ভারসাম্যপূর্ণ এবং সেখানে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান এবং পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ভূমি-সংক্রান্ত বিশেষ ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু কাঠামো রাখা হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চুক্তির বাস্তবায়ন, ভূমি বিরোধ, প্রশাসনিক ক্ষমতার বণ্টন এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, বিশেষ ব্যবস্থাগুলোর প্রয়োগে যদি কোনো একটি জনগোষ্ঠী নিজেকে বঞ্চিত মনে করে, তাহলে তা সামাজিক বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঐতিহাসিক বৈষম্য, ভূমি-অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার জন্য বিশেষ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষা প্রয়োজন। ফলে বিষয়টি কেবল ‘পাহাড়ি বনাম বাঙালি’ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
‘ *আদিবাসী’ স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক*
বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জোরালো হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, ঐতিহাসিক পরিচয় এবং জাতীয় অখণ্ডতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিভাষার ব্যবহার নিয়ে আপত্তিও রয়েছে।
জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকারবিষয়ক ঘোষণায় আত্মনিয়ন্ত্রণ, সাংস্কৃতিক অধিকার ও নিজস্ব বিষয়ে অংশগ্রহণের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারণাকে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করার অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাই ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক নীতি, বাংলাদেশের সংবিধান ও বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
*প্রশ্ন উঠছে বাঙালি নাগরিকদের অধিকার নিয়েও*
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি অংশের অভিযোগ, বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো ও কিছু নীতির কারণে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য বা অধিকার-সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। অন্যদিকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অভিযোগও রয়েছে—ভূমি দখল, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সাংস্কৃতিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সম্মুখীন।
অর্থাৎ বাস্তবতা হলো—উভয় জনগোষ্ঠীরই অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো একটি জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার সংকুচিত না করা।
‘ *এক বাংলাদেশ, দুই নীতি’—প্রশ্নটা এখানেই*
বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনের সমান আশ্রয়ের নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ নীতি থাকা সাংবিধানিকভাবে আলোচনার বাইরে নয়। কিন্তু সেই বিশেষ নীতি যদি কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থায়ী বঞ্চনা বা বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করে, তাহলে তা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি এমন একটি নীতি কাঠামো তৈরি করতে পারবে, যেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক অধিকার যেমন সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিসহ সব নাগরিকের সমান সাংবিধানিক অধিকারও নিশ্চিত হবে?
শান্তিচুক্তি বাতিল বা একতরফাভাবে পরিবর্তনের পরিবর্তে এর বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা, ভূমি সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান, সব জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করাই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।
কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো একটি জনগোষ্ঠীর নয়—এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের অংশ এবং সেখানে বসবাসরত প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।